জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন বাংলা গানের প্রভাব মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গানের প্রভাব

 

 



জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন বাংলা গানের প্রভাব

মূল্যবোধ সৃষ্টিতে গানের প্রভাব

মানুষ সব সময়ই স্বীয় সময়কে অতিক্রম করে কালোত্তীর্ণ হয়ে বাঁচতে চায়। আর এ বাঁচার যে সমস্ত মাধ্যম তার মাঝে স্থাপত্য, সৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য অন্যতম। মননশীল সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রধানতম মাধ্যম গান ও কবিতা। মুখে মুখে, বুকে বুকে এসব ছড়িয়ে পড়ে ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, যুগ থেকে যুগান্তরে । পৃথিবীর সকল দেশের শিশুরা মায়ের মুখে ঘুম পাড়ানি গান শুনতে থাকে, শুনে থাকে দেশ, প্রকৃতি, স্রষ্টা ও সৃষ্টি রহস্যের গান। এভাবেই মানুষ বয়সের এক একটি পর্যায়ে এক এক ধরণের গান ভালবাসে। এছাড়া উপলক্ষ্য ভেদেও গানের ধারা বদল হয় তার জীবনে । গান তার হৃদয় তন্ত্রীতে রাগ, অনুরাগ, ভালবাসা, স্নেহ-প্রীতি, মমতা, শ্রদ্ধা, ঘৃণা, দ্রোহ ও চৈতন্যের জন্ম দেয় । এসব চেতনা একজন মানুষের মূল্যবোধ তৈরীতে সাহায্য করে। গান সুখ দুঃখের সাক্ষী। অবচেতন মনে মানুষ গানের সুরে নিজেকে প্রকাশ করে।

প্রাচীন যুগের বাংলা গানে মূলতঃ সে সময়কালে ধর্মীয় মূল্যবোধ, পুরান কাহিনী, লোকগাঁথা ইত্যাদির উল্লেখ ছিলো বিধায় আমরা সমাজ মানসে তার প্রতিফলন দেখতে পাই । ড. আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ আরাকান রাজসভায় মুসলিম বাংলার যে প্রভাব আবিষ্কার করেন তাতে দেখা যায় পুঁথির এক বিরাট প্রভাব সেখানে ছিল এবং এসব পুঁথি যা মূলতঃ পয়ার ছন্দে রচিত যার উপজীব্য মূলতঃ ইসলামের ইতিহাস ও মুসলিম শাসকদের বীর গাঁথা, প্রজা হিতৈষী কার্যক্রম তার অনস্বীকার্য প্রভাব এখানে ছিল। অনুরূপভাবে পাল, সেন শাসকদের সময়ে যে গীতি কবিতা রচিত হয়েছে তাতে ধর্মীয় পুরানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্বের যে সুর বেজেছে তা এর শ্রোতা সাধারণের হৃদয়েও রেখাপাত করেছে।

বাংলা গানের আধুনিক যুগে এসে আমরা দেখি এর আঙ্গিক, ভাষা, বিষয় ও চিন্তনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে । নিধু বাবু কৃতক প্রবর্তিত বাংলা গানে মানবতার ধ্বজা উর্ধ্বে তুলে ধরার যে প্রয়াস; পরবর্তী পাঁচ প্রধান গীতি কবি তাকেই প্রসারিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংগীতে ধর্ম, দর্শন, দেশপ্রেম, স্বজাত্যবোধ, মানবতা ও আন্তর্জাতিকতার যে আলোক প্রক্ষেপণ করেছেন তা আজো দেদীপ্যমান। দ্বিজেন্দ্র লাল রায় (ডি.এল. রায়) বিশেষ ভাবে নন্দিত তাঁর অসাধারণ দেশের গানের জন্য । অতুল প্রসাদ এবং রজনীকান্ত গানে এনেছেন দেশ, জাতি, মানবতা ও প্রেমের শাশ্বত মূল্যবোধ। অপরদিকে কাজী নজরুল ইসলাম এসেছেন বাংলা গানের সব্যসাচী সর্বসংহারী রূপকার হিসাবে। বাংলা গানের বিশাল ভান্ডারে তাঁর একার গান চার সহস্রেরও বেশী। এখানে কী নেই? সুর বৈচিত্র্য, ভাষারলালিত্য, আরবী-ফরাসি শব্দের অপূর্ব বাংলা প্রয়োগ, বাণীর শ্রেষ্ঠত্ব নজরুলকে সত্যি সত্যি বাংলার বুলবুলের আসনে আসীন করেছে।

রবীন্দ্র নজরুল যুগ শেষে আরো বহু বিখ্যাত গীতিকার, সুরকারের নতুন নতুন গান বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করলেও বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির কাছে তাদের দু'জনের আবেদন এখনও

 

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন

অটুট। রবীন্দ্রনাথ নাগরিক মানসে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা দিলেও দেশের সর্ব সাধারণের কাছে নজরুল হচ্ছেন সর্বাধিক গ্রাহ্য ।

আমাদের দু'টি স্বাধীনতা আন্দোলনে (১৯৪৭ এবং ১৯৭১) দেশের সাধারণ জনগণকে উদ্দীপ্ত করেছে কতগুলো দেশের গান, শেকল ভাঙার গান, স্বাধীনতার গান, লড়াইয়ের গান, মুক্তির গান। এ গানগুলোর রচয়িতা প্রধানত: বিদ্রোহী কবি নজরুল, গোপাল হালদার, সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, তালাত মাহমুদ। নজরুলের গান কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন দরাজ গলার আব্বাস উদ্দিন, আব্দুল আলীম আর স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পীরা কন্ঠে তুলে নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক গানসমূহকে। বাংলাদেশের জনগনকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা, শোষণ বঞ্ছণার বিরুদ্ধে বুক পেতে লড়াই করার প্রেরণা যুগিয়েছে এইসব গান ।

সমকালিনতার বিচারে যদি আধুনিক বাংলা গানের স্বাধীনতা উত্তর কালকে বিবেচনা করি তাহলে আমরা দেখবো কিছু আধুনিক, রোমান্টিক, প্রেমের গান, দেশের গান, গণসংগীত ও ব্যান্ড ছাড়া বাংলা গানে নতুন সংযোজনের একটিই ব্যতিক্রমী ও বিশাল ধারা সৃষ্টি হয়েছে যেটিকে আমরা বলবো 'ইসলামী গানের নতুন ধারা' আর এর প্রভাবও দিগন্ত প্রসারী।

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টির কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে যা বিবেচনা অতীব জরুরী। এর প্রথমটি হচ্ছে বাংলা গানের শ্রোতা সমাজকে সামনে আনা। এর প্রধান শ্রোতৃ সমাজ বাংলা ভাষাভাষী মানুষ যাদের বৃহত্তম অংশ মুসলিম। এই মুসলিম সমাজের ধর্মীয় চিন্তা- চেতনা প্রথম দিকের বাংলা গানে উপেক্ষিত ছিল। বৌদ্ধ সহজিয়া, হিন্দু পুরাণ, ভজন, কীর্তন ও বন্দনা ছাড়া গানের সূচনা কিংবা ইতি হতো না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের তৌহিদ বিশ্বাস নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। গান মানেই শিরক কেন্দ্রিকতায় আচ্ছন্ন ছিল।

বিবেচনার দ্বিতীয় বিষয় মানুষের মাঝে মানবতার বোধ জাগ্রত করা এবং পরিপূর্ণ মানবতার বিকাশ যে আল কোরআন ছাড়া সম্ভব নয় তা প্রতিভাত করা। একই সাথে রাসূল করীম (সা) এর প্রেমে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা যিনি মানবতার মহান বন্ধু, সাম্যের একমাত্র প্রতীক, ইনসাফ ও আদলের প্রতিষ্ঠাতা।

বিবেচনার তৃতীয় বিষয় নশ্বর পৃথিবীর স্বার্থসিদ্ধির অন্ধ মোহে পতিত মানব সমাজের হৃদয়ে মৃত্যুর চিন্তা জন্ম দেয়া। পরকালীন সাফল্য, মানবতার কল্যাণে জীবনপাত করা এবং সকল মানবের কল্যাণে আত্মত্যাগের মনোভাব জাগ্রত করা। যা বাংলা গানের একটি বিরাট অধ্যায় জুড়ে ছিল এবং আছে।

বিবেচনার চতুর্থ বিষয় স্বাধীনতা ও স্বকীয়তার চেতনায় সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করা। শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করে, জালিমের জুলুমের অবসান ঘটিয়ে, জনতা সাগরে উত্তাল তরঙ্গমালা সৃষ্টি করে, জাতীয় ঐতিহ্যের গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে, হাতে হাত রেখে শপথে বলীয়ান একদল মানুষ তৈরী করা, যারা প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের পতাকাকে উড্ডীন রাখতে পারবে। দেশাত্মবোধক, উজ্জীবনী ও গণ সংগীতে এর উপস্থিতি

08

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন

বাংলা গানের প্রভাব

পাওয়া যায়।

বিবেচনার পঞ্চম বিষয় মানুষের হৃদয়ের কালি দূর করে সর্বমানবিক কল্যাণ বোধ, ভালবাসা, প্রেম, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের আলো দিয়ে ভরিয়ে দেয়ার আয়োজন। বাংলা লোকগীতি, ধর্মীয় সংগীতে এর প্রভূত অবস্থান লক্ষ্যণীয় ।

বিবেচনার ষষ্ঠ বিষয় বাংলা গানের শ্রোতাদের মাঝে যদি তথাকথিত আধুনিক প্রেমের গানের নামে কাম নির্ভর, দেহ সর্বস্ব, বেলেল্লাপনায় ভরা অশ্রাব্য ও অশোভন কথায় সাজানো গানের প্রসার ঘটানো হয়, শিরক, বিদআত, যিন্দিক আক্রান্ত গানে সবাইকে পাগলপারা করা হয় তাহলে আমাদের ভবিষ্যত বড়ই অন্ধকার। এ অবস্থা হতে পরিত্রাণের উপায় কী হওয়া উচিত তা সন্ধান করা।

বিবেচনার সর্বশেষ বিষয় প্রতিটি হৃদয়ে সঠিক মূল্যবোধের উজ্জীবন। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে স্রষ্টার প্রতি নিবেদন, মানবতার উৎকর্ষ সাধন, শান্তি, স্বস্তি ও কল্যাণের ফল্গুধারা সৃষ্টি করা।

বাংলা গানের মূল্যবোধ বিষয়ক বিশ্লেষণ ও সংগীতের কতিপয় ধারা :

রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষা, সুর ও বিষয় মৌলিকভাবে প্রায় এক এবং সহজে অনুমেয়। রবীন্দ্র সংগীতে সুর বৈচিত্র্য কম, বিষয় বৈচিত্র্য সেই তুলনায় বেশী । রবীন্দ্র সংগীতে প্রেমের গানগুলো কখনো মানব-মানবীর প্রেম, কখনো স্রষ্টার প্রতি নিবেদন, কখনো মানবতার আরতি হিসেবে বিবেচ্য হয়। তাঁর গানে দেশাত্মবোধক গানও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান ঘরোয়া আড্ডায় প্রায়ই বলতেন রবীন্দ্রনাথ কখনো অতি বিপ্লবী ছিলেন না যেমনটা ছিলেন নজরুল। এজন্য রবীন্দ্রনাথের কোন দ্রোহ ও প্রতিবাদের গান নেই ।

নজরুল ছিলেন সৃষ্টি বৈচিত্র ও মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সর্বতো সফল একজন কবি। তিনি যেমন গীতি কবিতা বা গান লিখেছেন, তেমনি সুর দিয়েছেন এবং গেয়েছেনও দরাজ গলায় । নজরুল জন্মেছেন গ্রামের গরীবালয়ে, বেড়ে ওঠেছেন সাধারন মানুষের মাঝে, মসজিদের পাশে থেকে, তার সকাল হয়েছে আজানের সুরে সুরে, শৈশব কেটেছে ঘাত-প্রতিঘাতে, যৌবন কেটেছে পলটনে, বিশ্ব সাহিত্য ও সমাজের সাথে সেখানেই তার পরিচয়, সেখানেই সৃজনশীলতার ঊষালগ্ন ব্যাপক সমালোচনায় অতিক্রান্ত হয়েছে, যারা তাঁকে কাফের ফতোয়া দিয়েছে তারাই আবার তাকে মাথার তাজ বানিয়ে উর্ধ্বে তুলে রেখেছে।

বাংলাদেশের মানুষের শাশ্বত বোধ বিশ্বাসকে আরো শাণিত করার লক্ষ্যে কাজী নজরুল ইসলাম একের পর এক রচনা করেছেন গান, নাটক, কবিতা, গল্প ও উপন্যাস। কিন্তু, তার গানই এক্ষেত্রে সব চেয়ে বেশী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে-

১. কাজী নজরুল ইসলাম প্রচুর সংখ্যক গান লিখেছেন আল্লাহর গুন গান, তৌহিদ, আল্লাহ প্রেম ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে যার দু'একটি উল্লেখ করা হলো:

 

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন મિર્ગાવાય

ক. আল্লাহ আমার প্রভূ আমার নাহি নাহি ভয় / আমার নবী মোহাম্মদ, যাঁহার তারিফ জগত্ময় ।

খ. শোন শোন এয়া এলাহি আমারি মুনাজাত / তোমারি নাম জপে যেন হৃদয় দিবস রাত। গ. রোজ হাশরে আল্লাহ আমার করোনা বিচার / বিচার চাইনা তোমার দয়া চাহে এ গুনাহগার।

ঘ. ফুলে পুঁছিনু বল বল ওরে ফুল / কোথা পেলি সুরভি রূপ এ অতুল । ঙ. এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি / খোদা তোমার মেহেরবানী। ২. তিনিই প্রথম এমন দরদ দিয়ে না'তে রাসুল লিখলেন, গাইলেন যে তা সর্বসাধারণ্যে রাসুলের

প্রতি ভালবাসার ভাব সৃষ্টি করলো নদীর জোয়ারের মতো যার সামান্য উদ্ধৃত করা হলো: ক. মুহাম্মদ নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে / তাই কিরে তোর কণ্ঠের এ সুর এত মধুর লাগে।

খ. মুহাম্মদ নাম যতই জপি তত মধুর লাগে......

গ. নাম মোহাম্মদ বোলরে ও মন নাম আহমদ বোল... ঘ. আমার মুহাম্মদের নামের ধেয়ান ওগো হৃদয়ে যার রয় / খোদার সাথে হয়েছে তার গোপন পরিচয়।

৫. আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ / যে পথে মোর চলে যেতেন, নূর নবী হযরত।

চ. তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে / মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে। ছ. ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর / বদনসীব আয়, আয় গুনাহগার, নতুন করে সওদা কর ।

জ. কালেমা শাহাদাতে আছে, খোদার জ্যোতি / ঝিনুকের বুকে লুকিয়ে থাকে যেমন মোতি ।

ঝ. মোহাম্মদ মোস্তাফা সাল্লে আলা, তুমি বাদশার বাদশাহ কমলিওয়ালা । ঞ. ইয়া মোহাম্মদ, বেহেশত হতে খোদাই পাওয়ার পথ দেখাও / এই দুনিয়ার দুঃখ থেকে

এবার আমায় নাজাত দাও । ট. হেরা হতে হেলে দুলে, নূরানী তনু, ও কে আসে হায় / সারা দুনিয়ার হেরেমের পর্দা

খুলে খুলে যায়।

৩. নজরুল মুসলিম উম্মাহর ঘুম ভাঙানোর জন্য মুয়াজ্জিনের মতো গেয়ে উঠলেন: ক. আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান / কোথা সে আরিফ অভেদ যাহার জীবন মৃত্যু জ্ঞান ।

খ. দিকে দিকে পূনঃ জ্বলিয়া উঠিছে দ্বীন ইসলামী লাল মশাল / ওরে বেখবর তুইও উঠ

জেগে তুইও তোর প্রাণ প্রদীপ জ্বাল । গ. বাজিছে দামামা বাঁধরে আমামা শির উঁচু করি মুসলমান / দাওয়াত এসেছে নয়া জামানার

ভাঙা কেল্লায় ওড়ে মিশান । ঘ. আমরা সেই সে জাতি / সাম্য মৈত্রী এনেছি আমরা বিশ্বে করেছি জাতি।

গু. ভোর হল, ওঠ জাগ মুসাফির, আল্লা-রসূল বোল / গাফলতি ভোরে অলস, আয়েশ আরাম ভোল ।

চ. শহীদী ঈদ্‌গাহে দেখ আজ জমায়েত ভারি / হবে দুনিয়াতে আবার ইসলামী ফরমান জারি

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন

ছ. তাওফিক দাও খোদা ইসলামে / মুসলিম জাঁহা পুনঃ হোক আবাদ....

৪. নজরুল তাঁর সমকালের এবং পরবর্তী সময়ের মুক্তিকামী মানুষের জন্য দরাজ গলায় * গাইলেন মুক্তির গান:

ক. কারারই লৌহ কপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট, রক্ত জমাট শেকল পূজার পাষান বেদী। খ. চল্‌ চল্‌ চল্, উর্ধ্বে গগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণীতল অরুণ প্রাতের তরুণ দল, চল রে চল রে চল্ ।

গ. দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার, লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশিথে যাত্রিরা হুঁশিয়ার। ৫. তাঁর গানে তিনি তুলে আনলেন জীবন্ত ঈদ ও ঈদের বানী। এখনও এ গানের আওয়াজ পেলেই আমরা বুঝি 'আজ ঈদ'। তার সেই বিখ্যাত গান ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ ......

৬. দেশাত্মবোধক গানেও নজরুল ছিলেন অসাধারণ পারদর্শী

ক. একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী..... খ. ওভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি...

এভাবেই কাজী নজরুল ইসলাম জাতীয় মূল্যবোধ উজ্জীবন, হারানো সম্বিৎ ফিরিয়ে আনা এবং আল্লাহ-রাসুলের ভালবাসায় সবাইকে জাগিয়ে তুলতে লাগলেন। চলমান ধারায় অজস্র গান রচনা করেছিলেন নজরুল, এমনকি শ্যামা সংগীত রচনায় তার পারঙ্গমতা যে কোন হিন্দু পন্ডিত ভক্তকেও হার মানায় । এসবেরই এক পর্যায়ে নজরুল ফিরে তাকালেন তাঁর অতীতের দিকে । অচেতন মুসলমানদের দিকে। তিনি রচনা করলেন প্রায় আড়াইশত ইসলামী গান । বাংলা গানে ইসলামী ধারার গানকে জনপ্রিয়, হৃদয়গ্রাহী ও ফলপ্রসু করতে পেরেছিলেন নজরুল। বিষয়, ভাষা, সুর, তাল ও লয় বিচারে নজরুল ইসলামের এসব গান এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ।

বাংলা গানে নজরুলের পথ ধরে এরপর লিখতে থাকেন কবি গোলাম মোস্তাফা, ফররুখ আহমদ, বন্দে আলী মিয়া, আব্দুল লতিফ, আজিজুর রহমান, সিরাজুল ইসলাম এবং রুহুল আমিন খান। এদের গান রেডিও পাকিস্তানের সুবাদে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে, শহর-গ্রামের মিলাদ মাহফিল ও জলসায় গীত হতে থাকে এই সব গান ।

১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে গানের জগতে আসে নতুন জোয়ার। এ সময় দেশাত্মবোধক ও গণ সংগীতের বেশ চর্চা বাড়তে থাকে । স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান ছড়িয়ে পড়তে লাগলো সারা দেশে। এদের মাঝে কয়েকটি উল্লেখ করছি মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি / মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।' 'পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে / রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল। "এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলবোনা, সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা সোনা নয় তত খাঁটি বল যত খাঁটি তার চেয়ে খাঁটি বাংলাদেশের মাটিরে আমার বাংলাদেশের মাটি'

এ সময় রোমান্টিকতা ও স্বদেশ প্রেম বিষয়ক অসংখ্য শিল্পগুণ সমৃদ্ধ আধুনিক গান বাংলা

 

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন বাংলা গানের প্রভাব

গানে সংযোজিত হয়। আবু হেনা মোস্তাফা কামাল, আবু জাফর, খান আতাউর রহমান, আব্দুল লতিফ, আজাদ রহমান, রফিউজ্জামান, গাজী মাযহারুল আনোয়ার, এস.এম. হেদায়েত, নজরুল ইসলাম বাবু, লোকমান হোসেন ফকির এর মতো গুণী গীতিকারদের সাক্ষাত মেলে। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের মতো বিশিষ্ট দেশাত্মবোধক গানের গীতিকার এ সময়ই উঠে আসেন ।

১৯৭২ থেকে পচাঁত্তর পর্যন্ত বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ধাক্কায় গানের জগতেও নতুন জোয়ার শুরু হয়। বগুড়া কেন্দ্রিক শিল্পীরা কোলকাতা ইয়ুথ কয়্যার এর অনুসরণে গড়ে তোলে 'বগুড়া ইয়ূথ কয়্যার' আর ঢাকায় গড়ে ওঠে 'ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী' এই দুটি সংগঠন গণসংগীতসহ লোকগীতির নতুন বিকাশে এগিয়ে আসে। ফকির আলমগীরদের দলটি এসময় জনমনে বেশ স্থান করে নেয়। অপরদিকে এসময়ে দু'একজন পপ শিল্পী বাংলা গানে পপের ধারায় কিছু করার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে থাকেন।

ইসলামী গানের নতুন ধারা : মূল্যবোধ রক্ষার নতুন অঙ্গীকার

স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পরে আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার মতো বাংলা গানের ক্ষেত্রেও একটি বন্ধ্যা সময় অতিক্রম করছিলাম আমরা। এ সময় আবার মাঠে ময়দানে নজরুল ইসলামকে ফিরিয়ে আনা হয়ে যায় সময়ের দাবী। দুর্বল বাণী, দুর্বল সুর আর উদ্দেশ্য বিহীন বক্তব্য সম্বলিত গানের বিরুদ্ধে একটি নতুন সুস্থ ধারার খুব দরকার হয়ে পড়েছিল।

ফলে কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, গোলাম মোস্তাফার পথ ধরে আশির দশকের শুরুতেই এই ধারাটি গড়ে ওঠে। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের নেতৃত্বে এই নতুন ইসলামী ধারাটি সামনে এগুতে থাকে। এক ঝাঁক নতুন গীতিকার তৈরি হন বিগত তিন দশকে। এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন- তফাজ্জল হোসাইন খান, রাশিদুল হাসান, চৌধুরী আব্দুল হালিম, চৌধুরী গোলাম মাওলা, আবুল কাশেম, কবি গোলাম মোহাম্মদ, আবু তাহের বেলাল, জাকির আবু জাফর, তারিক মনোয়ার, আমীরুল মোমেনীন মানিক, মাসুদ রানা প্রমূখ। এদের রচিত গান গাওয়া হতে লাগলো দেশের প্রতিটি অঞ্চলে, সাংস্কৃতিক মঞ্চে, মাহফিল, জলসায়, বের হওয়া শুরু হলো অডিও ক্যাসেট, সিডি ও ভিসিডি। নতুন ধারার গান যারা গাইতে থাকলো সেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন গানে যন্ত্র পরিহার করে বাণী ও সুরের লালিত্য আর কোরিও গ্রাফি এবং উপস্থাপনার নতুনত্বের দিকে দৃষ্টি দিলেন। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে এগুলো আলাদা ধারা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে লাগল ।

এক সময় এ ধারার গান গাইলে শ্রোতা সাধারণের সাড়া মিলতো খুবই কম। আজ এগুলো জনপ্রিয় গানগুলোর অন্যতম। দেশের বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত ওপেন এয়ার প্রোগ্রামে ছাত্র-ছাত্রীরা ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে এসব গান শোনার জন্য । এই গান শুধু তাদের কানকে সার্থক করে না, মনকে আন্দোলিত করে না, হৃদয়কেও আপ্লুত করে । এসব গানের কয়েকটি এখানে তুলে ধরছি বিবেচনার জন্য:

 

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন

মতিউর রহমান মল্লিকের গান

১. 'হাত পেতেছে এই গোনাহগার তোমারি দরগায় খোদা তোমারি দরগায় / শূন্য হাতে ওগো তুমি ফিরাইওনা আমায়'

২. এলো কে কাবার ধারে, আঁধার চিরে চিনি নাকি রে, ওকে ও মা আমিনার কোল জুড়ে চাঁদ, জানিস্ নাকিরে ।

৩. চল চল চল মুজাহিদ পথ যে এখনো বাকী, ভোল ভোল ব্যথা ভোল মুছে ফেল ঐ আঁখি ।

৪. শহীদ মালেক আজো আমায় ডাকে, সকল বাধা পেরিয়ে যেতে, সেই দিশারী আড়াল হতে হাঁকে । ৫. জনতার মনে উত্তাল ঢেউ মিছিলে মিছিলে সাড়া, জালেমের দল, জাহেলের দল ক্ষমা পাবে

নাকো তারা। ৬. ইমানের দাবী যদি কোরবানী হয় সে দাবী পূরণে আমি তৈরি থাকি যেনো ওগো দয়াময়

৭. সেকোন বন্ধু বলো বেশী বিশ্বস্ত, যার কাছে সব কথা বলা যায়, হওয়া যায় বেশী আশ্বস্ত

টিক টিক টিক টিক যেই ঘড়িটা বাজে ঠিক ঠিক ঠিক..... 1 ৯. তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর, না জানি তাহলে তুমি কত সুন্দর... ।

১০.দাও খোদা দাও হেথায় পূর্ণ ইসলামী সমাজ...। ১১. প্রশংসা সবই কেবল তোমারি রাব্বুল আলামীন... ।

১২. হে খোদা মোর হৃদয় হতে দূর করে দাও সকল কালিমা... ।

১৩. তোমার শিল্পী করে নাও আমাকে, করে নাও তোমার কবি... ।

১৪. তিনি নন তো শুধু আরবের, নন কোন চিহ্নিত সীমানার... ।

চৌধুরী গোলাম মাওলার গান:

১. এই গান সেই গান কতগান গাই শান্তি না পাই ।

২. আল্লাকে যারা বেসেছে ভালো দুঃখ কি আর তাদের থাকতে পারে...।

৩. ঘুমিয়ে আছো এই মাটিতে ও দুনিয়ার পরশ পাথর।

৪. ঐ কালো পর্দা তুমি টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলো.......।

৫. প্রতিদিন সূর্য ফিরে, ফিরে সোনালী জোসনা, শুধু ওরা ফিরে না..... ৬. আমাকে মানুষ কেন বানালে তুমি......।

৭. পলাশ ফুলের রঙ কেন লাল, শিমুল ফুলের রঙ কেন লাল... ।

চৌধুরী আব্দুল হালিমের গান:

১. লক্ষ চাদেঁর আলো নিয়ে তুমি এলে হে রাসুল, লক্ষ ফুলের সুবাস নিয়ে তুমি এলে হে রাসুল ।

২. এই তো সে দেশ সাঝের বেলায় যেথা ভেসে আসে দূর হতে ভাটিয়ালী সুর ......

ঐ । পাহাড় আর গাছ গাছালি নীল ঝরণার গান, জানিগো প্রভূ জানি যে শুধু সকলি তোমার দান। ৪. ওগো মোর জন্মভূমি তোমার-ই কোলে জন্ম নিয়ে ধন্য আমি.....।

৩.

 

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন

বাংলা গানের প্রভাব

এ ছাড়া কয়েকজনের কয়েকটি গানের উদ্ধৃতি দেয়া হলো:

১. "আমাকে শহীদ করে সেই মিছিলে শামিল করে নিও, যেই মিছিলের নেতা আমির হামজা খোবায়ের খাব্বাব খোদার ছিল যারা অতি প্রিয়।” তারেক মনওয়ার “আজও সেই কোরআন আছে হাদীস আছে, সেই ঈমান আর মানুষ নেই।" - ঐ "তুমি আছো হৃদয়ের গভীরে ভুলবো তোমায় বলো কি করে।" - ঐ

২. “আল্লাহ এই দেশ তোমারই দান, কৃতজ্ঞ আমরা তোমার কাছে রেখ আমাদের মান। "- ইছহাক ওবায়দী

ভাটি গাঙ্গের নাইয়া আমারে যাও লইয়া / আর কতকাল ঘাটে ঘাটে যাইবোরে কান্দিয়া।"

আমিরুল মোমেনীন মানিক “অসীম দিগন্তে তাকালেই মনে হয় আকাশ ছুঁয়েছে মাটিকে, হৃদয় সাগরে উঠে তখনি ঢেউ

তোমাকে মনে পড়ে।" - ঐ

ঐ ঝরনা ধারা বয়ে যায় পাহাড়কে ছুঁয়ে ছুঁয়ে... । '

"বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নিয়ে ধন্য হলাম চির ধন্য... । ঐ ৪. “হলদে ডানার সেই পাখিটি এখন ডালে ডাকে না, মনের কোণে রঙ্গীন ছবি এখন সে আর আকে না। ”- গোলাম মোহাম্মদ

হিজল বনে হারিয়ে গেছে পাখি যতই তারে করুণ কেঁদে ডাকি, দেয় না সাড়া নিরব গহীন বন।" - ঐ

সেই সংগ্রামী মানুষের সারিতে আমাকেও রাখিও রহমান। যারা কোরআনের আহ্বানে নির্ভিক নির্ভয়ে সব করে দান । - ঐ

রোজ বিহানে একটা পাখি আল্লা আল্লা ডাকে; সেই পাখিটার গানে গানে হৃদয় দুলতে থাকে।" ঐ ৫. সাধারণ্যের সংগীতে একক অবদান শিল্পী আবুল কাশেমের । তার কয়টি গানের উদ্ধৃতি

দেয়া হলো:

'আমি বলব কি সমাজের কথা এখানে ভালো মন্দের বিচার নাই। সৎ সততা নাইরে নাই। সমাজেরই কলকব্জা সব ঘুরাইতাছে মন্দরাই।' "শ্রমিক মজুর মুটে মাঝি রিক্সাওয়ালা ভাই, বাঁচার কথা বলি শোন মন দিয়া সবাই ।' *বীর মুসলমান ধর আল কুরআন, ফিরায়ে আন সেই হারানো সম্মান...।

৬. "হাজার গানের মাঝে একটি গানও যদি / আল্লার কাছে প্রিয় হয় । সেইতো সফলতা, সেইতো সঠিক কথা, চাওয়া পাওয়া আর কিছু নয়।" আবু তাহের বেলাল 'পৃথিবীর হাজারো কাজের ভীড়ে, একামতে দীনের এ কাজ যেন আমার কাছে প্রিয় হয়.. । ঐ

৭. "আমাদের এক করে দাও নেক করে দাও ওগো দয়াময়" তফাজ্জল হোসাইন খান আল্লা আমার রব এই রবই আমার সব, দমে দমে তনু মনে তাঁরই অনুভব ।

৮. 'চোখের অশ্রু ঝরালে কি দুঃখ প্রকাশ করা হয় । মনে অনেক দুঃখ থাকে ওজনে কি মাপা

 

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন

যায়?' - মাসুদ রানা

আমি মেঘমুক্ত আকাশ দেখেছি তারা ভরা... । ঐ

"একটি মানুষ আজও আমার আছে হৃদয় মাঝে... । ঐ বাংলা গানের ভান্ডারে নব চেতনার উন্মেষ ঘটে নতুন ধারার ইসলামী গানের সংযোজনের মধ্য দিয়ে। এ ধারা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে, পাচ্ছে জনগনের মাঝে শক্ত ভিত। এর ফলে নতুন প্রজন্মের মাঝে মূল্যবোধ সমূহ প্রোথিত হচ্ছে। আবার আমরা যেনো ফিরে পাচ্ছি আমাদের হারানো সম্বিত, পূর্ব পরিচয় ।

ইসলামী গানের এই ধারার উৎকর্ষের পাশাপাশি আবার শিল্পীদের কণ্ঠে কণ্ঠে উঠে এসেছে নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তাফা, ফররুখ আহমদ, আব্দুল আলিম, সিরাজুল ইসলামের গান। আবার বাংলার পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পল্লীগীতি, ভাটিয়ালী, জারী, সারি, বাউল গান উঠে এলো শহর-বন্দরের মঞ্চে মঞ্চে। স্থান পেতে থাকলো তা অডিও ভিডিও ক্যাসেটে । নতুন চ্যানেলগুলোও এসবের কদর করতে বাধ্য হলো। এভাবেই মূল্যবোধের বিষয়টি যত্ন পাওয়া শুরু হলো।

বাংলা গানে মূল্যবোধ বিরোধী চক্রান্ত :

বাংলা গানের উন্মেষ কাল থেকেই এখানে মূল্যবোধ বিরোধী একটি চক্রান্ত সু-কৌশলে স্থান করে নেয়। গানের জগতটি দখল করে ছিলো হিন্দু ধর্মের ভক্তিগীতি রচয়িতাগণ । পরবর্তীকালে যদিও মুসলিম গীতিকার ও গায়কদের একটি অংশ এগিয়ে এসেছেন মূলত: তারা ছিলেন শাস্ত্রীয় গানের ওস্তাদ। গানকে আদর্শ বিস্তার, মূল্যবোধ তৈরী ও মানসিক গোলাম তৈরীর একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে ইংরেজ শাসকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও ষড়যন্ত্রের ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধ বিশেষ করে মুসলিম ধর্মীয় চেতনা পরিপন্থী তথা কথিত সেক্যুলার মানব-ধর্ম রূপী মতাদর্শ কেন্দ্রিক একদল বাউল ও ভক্তিগীতির গায়েন ছড়িয়ে দেয়া হয়। উত্তর ভারতে কবীর নানক এবং বাংলায় লালন এদের অন্যতম। এ গানের বিস্তৃতি, এই গান কেন্দ্রিক একটি দল গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের বিশিষ্ট গীতিকার ও সুরকার কবি আবু জাফর দু'টি প্রবন্ধে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তুলে ধরেছেন লালনের বা কবীরের ধর্ম পরিচয় আড়াল করে গানের ভাষায় মূলত: শিরক ও যিন্দিক চিন্তাকে তুলে আনা হয়েছে। বিশেষ করে লালনের গানে দেহ তত্ত্বের নামে যৌনতা ও কামলীলার সুচতুর বর্ণনা করা হয়েছে। অবাচীন মানুষ প্রচারণা ও প্রতারণার ফাঁদে পড়ে এতদিন এসবকে ভক্তিমূলক, দেহতাত্ত্বিক ও দার্শনিক কথা বিবেচনা করে আসছিল ৬।

বাংলা গানে এরূপ আরেকটি আয়োজন ভান্ডারী বা মাজার কেন্দ্রিক সংগীত সমূহ। এসব গানের ছত্রে শিরক, বিদয়াত ছড়িয়ে আছে। সবচেয়ে মারাত্মক বিষয়টি হচ্ছে এসব গানের গায়ক-গায়িকাগণ, এসব গানের আসরসমূহে গঞ্জিকা সেবন, উদ্বাহু মাতাল নৃত্য, মুসলিম সমাজের স্বাভাবিক ইবাদাতের (যেমন নামাজ) ব্যাপারে উদাসীন থেকেও আল্লার সন্তুষ্টি

 

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন

বাংলা গানের প্রভাব

প্রাপ্তির নিশ্চয়তা ঘোষণার মতো বিষয়গুলোকে তুলে আনা হয়। অধর্মকে ধর্ম বলে চালিয়ে দেয়াই শুধু নয় প্রতিষ্ঠা প্রদানই যেনো এসবের কাজ। একটি বিস্ময়কর, কৌতুককর ও চিন্তার বিষয় হচ্ছে- ভান্ডারী, মুরশিদী, বাউলসহ এ জাতীয় গানের অধিকাংশ গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী অমুসলিম প্রধানত: হিন্দু মুশরিকগণ । ধর্মীয় মূল্যবোধকে ভিন্নভাবে বিনষ্ট করার ক্ষেত্রে এসব গানের প্রভাব যে কত সুদূর প্রসারী তা চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই বুঝতে পারেন ।

সমকালীন বাংলা গানে স্বাধীনতা উত্তর কালে অল্প-স্বল্প বিচ্যুতির যে সূচনা হয় তা বর্তমানে একটি মারাত্মক রূপ লাভ করেছে ব্যান্ড সঙ্গীত, হিন্দি গান আর পপ ও রকের আমদানীর মধ্য দিয়ে। এসব গানের মূল প্রবণতা যন্ত্র নির্ভরতা, শারীরিক কসরত প্রাধান্য, সস্তা, চটুল ও অশালীন বক্তব্যের ছড়াছড়ি। বিশেষ করে বাংলা সিনেমায় হিন্দিগানের নকল কথা ও সুর ছড়িয়ে পড়ছে বিষের মতো। হলিউড, বলিউডের পথ ধরে ঢালিউডে ছড়িয়ে পড়েছে নগ্নতা, অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও দেহ সর্বস্বতার রোগ। ক্যান্সারের মতো এটি আমাদের গানের ভুবনকে আক্রান্ত করে ফেলেছে। লালনের গানে শিল্প সুষমা ও বর্ণনার চাতুর্যে দেহতত্ত্বের নামে যে বিষয়গুলোকে বর্ণনা করা হয়েছে এখনকার গানে সেগুলোকে সচিত্র ও সরসভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলা গানের এই করুণ দশা নিয়ে দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের গান শোনা যাক:

১. মাঝি আর গায়না কোন ভাটিয়ালী গান

বাউলের এক তারাতে নাই আর কোন প্রাণ আমার বাংলা গানের একি দশা হইলোরে ।

গাঙ্গের জলের মতো ভাইসা কি সুর আইলোরে

কোথায় আমার পল্লী বধুর স্বপ্ন সুখের হাসি

রাখাল যেথায় বাজাতো ভাই প্রাণ জুড়ানো বাঁশি রাখালও নাই বাঁশিও নাই যুগের হাওয়ায় সব বদল হইলোরে ।" ২. হারিয়ে গেছে জসিম উদ্দীন ও তাঁর নকশী কাঁথাও নাই লালন শাহের এক তারাটা কোথায় গেলে পাই আমি কোথায় গেলে পাই ।

ফিরিয়ে দাও সেই অরণ্য

হাজার ষড়যন্ত্রের মাঝেও বাংলা গান তার সবকিছু হারায়নি। এখনও আমাদের মহান গীতিকাররা প্রতিনিয়ত জন্ম দিচ্ছেন নতুন নতুন দেশের গান, ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, মন মাতানো গণ সঙ্গীত, আধুনিক গান যা বারবার আমাদের হৃদয়কে আলোড়িত করে,

মূল্যবোধগুলোকে উজ্জীবিত করে। মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসে কালজয়ী গান *এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদী তটে......

 

 

জাতীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সমকালীন বাংলা গানের প্রভাব

"আমারো দেশেরো মাটিরো গন্ধে ভরে আছে সারা মন, শ্যামল কোমল পরশ ছাড়া যে নেই

কিছু প্রয়োজন।

আমি বাংলার গান গাই, আমি বাংলায় গান গাই......

বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার জন, বাংলার মন সব সময়ই সুন্দর ও সত্যের পক্ষে ছিলো, আছে এবং থাকবে। দেশী বিদেশী চক্রান্তকারীদের কোন ষড়যন্ত্রই আমাদেরকে শেকড়চ্যুত করতে পারেনি। ইংরেজ যখন লালন, নানক কবীরদের জনপ্রিয় করে তুলেছিলো। তখন জেগে উঠেছিলো মুন্সী মেহেরুল্লাহ আর মীর মোশাররফ হোসেন। যখন ভজন, কীর্তন, বৈষ্ণব গান হয়ে উঠেছিল নিত্যগীতি তখন সুর ও বাণীর বিচিত্র সম্ভার নিয়ে এলেন নজরুল, গোলাম মোস্তাফা । তাদের সাক্ষী হলেন আব্বাস উদ্দিন আর আব্দুল আলীম। আর আমাদের সমকালে যখন হিন্দিগানের জোয়ার জ্বরে সবাই উন্মাতাল তখন গণমাধ্যম, ক্যাসেট, সিডি এবং মঞ্চ-মাঠে এগিয়ে এসেছে অসংখ্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী যারা এই জোয়ারের বিপরীতে তৈরী করছে একটি ভিন্ন স্রোত ।

গান মানুষের হৃদয়ের তন্ত্রীতে গেঁথে দেয় বিশেষ বিষয়। আনন্দ, বেদনা, শৌর্য-বীর্য, হাসি-কান্না, আবেগ আকুতি প্রকাশের এক অনবদ্য সর্বজন গ্রাহ্য মাধ্যম গান। মানুষের চৈতন্যে গানের প্রভাব কার্যকর । এজন্য প্রতিটি মানুষ বৃষ্টির গানের মতো, ঝরণা ও নদীর কলতানের মতো, পাহাড়ের মৌনতার মতো, নীলিমার ভাষার মতো গানকে ভালবাসে। একা একা হলেও সে গান গায়, কন্ঠ চড়িয়ে কিংবা গুনগুনিয়ে।

বাংলা গানের বর্তমান অনুকরন প্রিয়তা, নকল প্রবণতা ও বিষয়ের দৈন্য কাটিয়ে ওঠা আজ সময়ের দাবী। আমরা বিশ্বাস করি এ বন্ধ্যাত্ব ও জড়তা কাটিয়ে বাংলা গান সুরের বৈচিত্র্য, বানীর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে এদেশের সত্যনিষ্ঠ সহজ-সরল মানুষের মূল্যবোধকে সব সময়ই জাগরিত করবে।

তথ্যসূত্র :

>. To evoke in one self a feeling one has experienced and having evoked it in one self then by means of movement, hues, colour, sounds or forms expressed in words so to transmit that feeling that others experience the same feeling this is the activity of art. Tolstoy. ২. বাংলা গানের বিবর্তন, করুণাময় গোস্বামী, বাংলা একাডেমী, পৃ: ১২।

৩. বাংলা গানের ধারা, হাজার বছরের বাংলা গান; মৃদুল কান্তি চক্রবর্তী, প্যাপীরাস, ভূমিকা। ৪. অভিভাষণ, সংগীত সংঘের বার্ষিক উৎসব, ১৯১২; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

৬. ইসলাম ও আত্মত্মঘাতী মুসলমান, আবু জাফর । ৭. তপন চৌধুরীর গাওয়া গান ।

 

Comments